মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে বালিয়াকান্দি

 

মুক্তিযুদ্ধে বালিয়াকান্দি

 

বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার সাবেক গোয়ালন্দ মহকুমার বালিয়াকান্দি মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি থানা। তৎকালে অত্র থানার অন্তর্গত ১০টি ইউনিয়ন ছিল। বর্তমানে ৩টি ইউনিয়ন (মেগচামী, গাজনা, ডুমাইন) মধুখালী থানার অন্তর্গত। অবশিষ্ট ৭টি ইউনিয়ন, যথা-ইসলামপুর, বহরপুর, নবাবপুর, নারুয়া, বালিয়াকান্দি সদর, জঙ্গল ও জামালপুর বালিয়াকান্দি উপজেলাধীন আছে।

 

       ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বালিয়াকান্দি থানা ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আক্রমণে প্রথম পর্যায়ে শত্রমুক্ত হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শেখ নজরুল ইসলাম(এফএফ বাহিনী) ও শেখ আব্দুল ওহাব (মুজিব বাহিনী) নেতৃত্ব দেন এবং এই সম্মুখ যুদ্ধে থানার রাজাকার কমান্ডার আক্কাছ আলী ও অবাঙ্গালী পুলিশ সদস্য আঃ ওয়াহেদ এবং আঃ সামাদ নিহত হয়। মোট ৩৬জন স্বশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ৩টি দলে বিভক্ত হয়ে সম্মুখ যুদ্ধ করে শত্রু মুক্ত হয়। এর পূর্বেই থানার নলিয়া/জামালপুর রেল ষ্টেশনের কুখ্যাত অবাঙ্গালী ডাক্তার বাহাউদ্দিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হয় এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা থানার বিভিন্ন ইউনিয়নের রাজাকার বাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। অত্র বালিয়াকান্দি থানায় কোন খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা নাই।

 

       ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সাবেক বালিয়াকান্দি থানার ডুমাইন, নিশ্চিন্তপুর ও কামারখালী ঘাট এলাকায় শত্রুবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। এঁরা ১.শহীদ খলিলুর রহমান ২.শহীদ মফিজুর রহমান ৩.শহীদ হাফিজুর রহমান। বর্তমান মাগুড়া জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন কাদিরপাড়া ইউনিয়নের কমলাপুর গোড়স্থানে শহীদ খলিলুর রহমানের লাশ কবর দেওয়া হয় এবং শহীদ মফিজুর রহমানের লাশ তাঁর পারিবারিক কবরস্থানে কবর দেওয়া হয় এবং  শহীদ হাফিজুর রহমানের লাশ পাক-বাহিনী নিয়ে যায়। শেখ ওহাব আলী নামীয় একজন যু্দ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আছেন।

      

       ২৫ সেপ্টেম্বর,১৯৭১ বালিয়াকান্দি থেকে বহরপুর হাইস্কুলে থানার কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়। এ সময় বহরপুর বাজারের “মাইকের বাপ” বলে পরিচিত এক মাদ্রাজী অবাঙ্গালী রাজাকারের নেতৃত্বে বহরপুর, ইসলামপুর ও নবাবপুর ইউনিয়নের বহু জনগণ নানা প্রকার নির্যাতনের স্বীকার হয়। অতঃপর পাংশা থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হোসেন কমান্ডারের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধার সম্মিলিত আক্রমণে অক্টোবার মাসের মাঝামাঝি দ্বিতীয় দফায় থানা শত্রুমুক্ত হয়। ইসলামপুর ইউনিয়নের রামদিয়া বাজার সংলগ্ন সাহা পাড়া, রামদিয়া, নওপাড়া, শাল বরাট, খালকুলা, নারায়নপুর গ্রামে চাঁদখান নামের অবাঙ্গালী রাজাকার পাক-বাহিনীর সাথে যু্ক্ত হয়ে অগ্নি সংযোগ, লুটতরাজ, নারী ধর্ষণ করে এবং নির্বিচারে সহস্রাধীক লোক হত্যা করে এবং চাঁদ খার দ্বারা নবাবপুর ইউনিয়নের পদমদী গ্রামের হেমন্ত চক্রবর্তীর বাড়ীতে লুটপাট, অগ্নি সংযোগসহ দুই মহিলার ইজ্জত হানীর শিকার হয়। অত্র থানার নারুয়া বাজার সংলগ্ন বাকসাডাঙ্গী সাহা পাড়া, নারুয়া বাজার বেপারী পাড়া ও আওয়ামীলীগ নেতা মুন্সি ইয়ার উদ্দিন আহমেদের বাড়ীতে লুটপাট ও অগ্নি সংযোগ করে। পাক-বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্থানীয় রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্যরা লক্ষ লক্ষ টাকার ক্ষতিসাধন করে এবং পাক বাহিনী আওয়ামীলীগ নেতা মুন্সি ইয়ার উদ্দিন আহমেদ কে যশোর ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায়। পাক বাহিনী বালিয়াকান্দি যাওয়ার সময় নারুয়া খালের মধ্যে একজনকে গুলি করে হত্যা করে ফেলে যায়। এর আগেই পাক-বাহিনী থানার জংগল ইউনিয়নের হিন্দু এলাকায় ব্যাপক জালাও পোড়াও শুরু করে ভীতির রাজত্ব কায়েম করে। ফলে সবাই সবকিছু ফেলে শরনার্থী হয়ে দলে দলে ভারত চলে যায়।

 

       ১৯৭১ এর ২৩ সেপ্টেম্বর পাক-বাহিনী বালিয়াকান্দি থানা পুনঃউদ্ধারের উদ্দেশ্যে কালুখালী রেল স্টেশন হইতে পায়ে হেটে বালিয়াকান্দি আসার পথে সোনাপুর বাহের পাড়ার একজন, সদাশিবপুর গ্রামের দুইজন ও ইলিশকোল গ্রামের একজন মহিলার ইজ্জত হরণ করে।পাক-বাহিনী তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তার জন্য থানার প্রত্যেক ইউনিয়নে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনী গঠন করে-যার নেতৃত্বে ছিলেন এ,কে, এম সামসুদ্দোহা(বাবুমিয়া) এবং আব্দুল গফুর মোল্লা(প্রয়াত চেয়ারম্যান ইসলামপুর)।তাদের সহায়তা করেন হাতেম আলী, পি,এল,এ, নিশ্চিন্তপুর, বালিয়াকান্দি।

 

       স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১৯৭২ সালে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু কর্তৃক কোলাবোরেটর আইন প্রণয়ন করিলে এই আইনের আওতায় বালিয়াকান্দি থানায় কয়েকটি মামলা দায়ের হয়।তন্মধ্যে রুস্তম আলী শেখ সাং বাকসা ডাঙ্গী (ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন ) বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। উক্ত মামলায় এ,কে, এম সামসুদ্দোহা সহ ২৩জন আসামীর নাম ছিল।

 

 

                                                       ইতিহাস রচনাঃ জনাব এ এ এম আব্দুল মতিন

                                                                        উপজেলা কমান্ডার ,

                                                                        বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সংসদ

                                                                        বালিয়াকান্দি , রাজবাড়ী ।